যে হাট কৃষককে খায়
আজ চাঁদ রাত। কাল, ২৮ মে ২০২৬, ঈদুল আজহা। ঢাকার পশুর হাটগুলোয় গত কয়েক দিন ধরে দাম নামছিল, আর শেষ দিনে এসে তা অর্ধেকেরও নিচে ঠেকেছে। চুয়াডাঙ্গা থেকে গরু এনেছিলেন এক ব্যবসায়ী, দাম চেয়েছিলেন আড়াই লাখ টাকা; এখন তাঁকে বলা হচ্ছে এক লাখ বিশ হাজার। মেরাদিয়ার হাটে হাসিল বুথে বসা এক কর্মী দেখলেন, সকালে যে পশু দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সন্ধ্যায় সেটিই চলে যাচ্ছে সত্তর থেকে আশি হাজার টাকায়।
এটা কোনো খারাপ বছরের ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। ব্যবস্থাটা ঠিক এভাবেই চলার কথা, আর সেভাবেই চলছে। বাংলাদেশ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কোরবানির পশু পালন করে, প্রতিটির দাম ঠিক করে চোখের আন্দাজে, কয়েক ডজন ঢাকার হাটে সেগুলো জড়ো করে, তারপর বিক্রেতার ঘাড়ে সব ঝুঁকি চাপিয়ে সেগুলোকে সেখানে আটকে রাখে; আর দিনে দিনে আরও খারাপ হতে থাকা ক্রেতার বাজার এই ফাঁকে কৃষকের লাভটুকু কেড়ে নেয়। দেশ আগেই দেখিয়ে দিয়েছে, সে অনলাইনে গরু বেচতে পারে, কেজি দরে ওজন করেও বেচতে পারে। যেটা সে করেনি, তা হলো এই ওজন আর দাম ঠিক করার পদ্ধতিকে ব্যতিক্রম না রেখে নিয়মে পরিণত করা। আসল সংস্কার সেখানেই, পশুর ঘাটতিতে নয়।
ভুল দামের হিসাবটা কত বড়
ঈদুল আজহা বাংলাদেশের পঞ্জিকার সবচেয়ে বড় একক বাণিজ্যিক ঘটনা। অর্থনীতিবিদদের হিসাবে, এই উৎসব ঘিরে প্রায় ১,০০,০০০ কোটি টাকার (মোটামুটি ১ লক্ষ কোটি, প্রায় ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার) অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হয়, যার মধ্যে শুধু পশুর ভাগই আনুমানিক ৬০,০০০ কোটি টাকা। ঈদ ২০২৬-এর জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (DLS) বলেছে, কোরবানির পশু প্রস্তুত আছে ১.২৪ কোটিরও বেশি, আর চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ১.০১ কোটি; অর্থাৎ অধিদপ্তরের হিসাবেই উদ্বৃত্ত প্রায় ২২ লাখ। এই বাজারের জন্য পশু পালেন পাঁচ লাখেরও বেশি কৃষক।
এই বাড়তি সরবরাহ আকস্মিক নয়। ২০১৪ সাল থেকে ভারত গরু রপ্তানিতে কড়াকড়ি শুরু করে; একসময় বছরে দশ লাখেরও বেশি বলে ধরা হতো যে প্রবাহ, সেটা বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশ নিজের পায়ে দাঁড়ায়। দেশের গবাদিপশুর সংখ্যা ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ২.৩৬ কোটি থেকে বেড়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দাঁড়ায় ২.৫০ কোটিতে, আর প্রাণিসম্পদ খাত এখন কৃষি জিডিপির ১৬.৩৩ শতাংশ জোগায়। সরবরাহের সমস্যা দেশ মিটিয়ে ফেলেছে। বাজারের সমস্যাটা মেটায়নি।
এই উদ্বৃত্ত কাঠামোগত, আর হাটে কী ঘটবে তা অনেকটাই এর ওপর নির্ভর করে। কোরবানি যত হবে, তার চেয়ে এক-পঞ্চমাংশ বেশি পশু যখন প্রস্তুত করা হয়, তখন শেষ দিনের প্রান্তিক বিক্রেতার হাতে দরকষাকষির কোনো জোরই থাকে না। বাস্তবে কোরবানি হওয়া পশুর সংখ্যা ২০২৪ সালের ১.০৪ কোটি থেকে ২০২৫ সালে নেমে আসে ০.৯১ কোটিতে, অর্থাৎ পতন প্রায় ১২ শতাংশ; সরবরাহ চড়া থাকলেও চাহিদা যে নরম হচ্ছে, সংখ্যাটা তা-ই বলে। নির্দিষ্ট সময়সীমার ভেতরে চড়া সরবরাহ আর দুর্বল চাহিদার এই মুখোমুখি অবস্থানই প্রতি ঈদে ফিরে আসা দরপতনের আসল কারণ।
চোখের আন্দাজে দাম
বাংলাদেশের যেকোনো পশুর হাটে ঢুকলে এই বাণিজ্যের সবচেয়ে পুরোনো দাম ঠিক করার পদ্ধতিটা চোখে পড়বে: পাকা হাতে পশুর পাঁজর, পেট আর পিঠ টিপে মাংসের পরিমাণ আন্দাজ করা, তারপর দীর্ঘ দরকষাকষি। কোনো ওজনযন্ত্র নেই। এক থেকে তিন লাখ টাকা দামের একটা জ্যান্ত পশুর দাম ঠিক হয় নিছক অনুমানে আর কখনো না-দেখা দুজন মানুষের আপেক্ষিক সাহসের জোরে।
এটা নিরীহ কোনো অদক্ষতা নয়; এটা মাপা যায় এমন অদক্ষতা। গবাদিপশুর ওজন আন্দাজ নিয়ে এক সমকক্ষ-পর্যালোচিত গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ ক্ষেত্রে চোখের আন্দাজ পশুর আসল ওজন থেকে ১০ শতাংশের বেশি দূরে ছিল, আর গড় পরম ভুল প্রায় ১৫ শতাংশ। ভুলটা ছিল একমুখী: ভারী পশুর ওজন কম ধরা হতো, হালকা পশুর ওজন বেশি। বুকের বেড় মাপার ফিতা, সবচেয়ে সাদামাটা মাপের যন্ত্রটাই, অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য ছিল, আর প্রত্যয়িত একটা ওজনযন্ত্র আন্দাজের জায়গাটাই পুরো মুছে দেয়।
এই ভুলের খেসারত সবাই সমানভাবে দেয় না। গ্রামের অভিজ্ঞতা নেই এমন এক শহুরে ক্রেতা বিক্রেতার চোখের দয়ার ওপর নির্ভরশীল; আর মধ্যস্বত্বভোগীর হাত দিয়ে বিক্রি করা কৃষক নির্ভরশীল ক্রেতার দয়ার ওপর। ওজন দরে কিনতে শুরু করা এক শহুরে ক্রেতা যেমন বলছিলেন, জ্যান্ত ওজনে কেনায় অন্তত "এই স্বস্তিটুকু পেয়েছি যে ওজনে আমাকে ঠকানো হয়নি।" তথ্যের এই অসমতাই হাটের আসল চরিত্র, আর শেষ দিনে এসে তা পুরোপুরি তার বিপক্ষে চলে যায়, পালানোর ক্ষমতা যার সবচেয়ে কম।
সময়সীমার ফাঁদ
কৃষক বা ছোট ব্যবসায়ী পালাতে পারেন না, আর হাটের সবাই সেটা জানে। তিনি পশু ট্রাকে তুলেছেন, দেশের এক প্রান্ত থেকে ঢাকায় টেনে এনেছেন, হাটে জায়গা ভাড়া নিয়েছেন, খোলা আকাশের নিচে কয়েক দিন পশুকে খাওয়াতে-পানি দিতে লোক রেখেছেন। প্রতিটা বাড়তি দিন মানেই খরচ, আর কিছু নয়। দিন যত ফুরিয়ে আসে, হিসাবটা তত নির্মম হয়ে ওঠে: আজ কম দামে ছেড়ে দেওয়া, নাকি কাল অবিক্রীত পশু আবার বাড়ি টেনে নেওয়ার নিশ্চিত খরচ।
শেষ দিনে এসে প্রস্তাব নেমে আসে চাওয়া দামের প্রায় অর্ধেকে।
পশু ফিরিয়ে নেওয়াও খুব একটা ভালো বিকল্প নয়। ফেরত পরিবহনে প্রতি পশুতে লাগে প্রায় ১০,০০০ টাকা, আর তারপর সেটিকে খাওয়াতে হয়, নতুন করে বিক্রির ব্যবস্থা করতে হয়; ব্যবসায়ীদের ভাষ্যে প্রতি পশুতে মাসে লালন-পালন খরচ ১২,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা। গাবতলীতে নয়টি গরু নিয়ে আসা এক ব্যবসায়ী হিসাব কষে দেখেছেন, দাম কম থাকলে পরিবহন, হাটের ভাড়া আর শ্রম মিলিয়ে প্রায় ২ লাখ টাকার লোকসান গুনতে হতে পারে। আগের কোনো এক ঈদে, এক হাটের বর্ণনা অনুযায়ী, রাজধানীতে আনা প্রায় অর্ধেক গরু অবিক্রীত থেকে যায়, আর যেসব কৃষক ঋণ করে কিংবা জমি বেচে পশু কিনেছিলেন, তাঁদের লোকসানেই ছেড়ে দিতে হয়। সময়সীমা কৃষকের পক্ষে যায় না। জিতে যান ঢাকার কাছে থাকা সেই ক্রেতা, যিনি শেষ কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে পারেন।
ঝুঁকি কার ঘাড়ে, জেতে কে
এই দরপতন দুর্ঘটনাজনিত বাজার-ব্যর্থতা নয়। এটা ঝুঁকির একটা বণ্টন, আর সেই ঝুঁকির প্রায় পুরোটাই গিয়ে পড়ে তাদের ঘাড়ে, যাদের সেটা সামলানোর ক্ষমতা সবচেয়ে কম। এই উৎসবে স্পষ্ট বিজয়ীও আছে, স্পষ্ট পরাজিতও আছে।
| অংশীজন | অবস্থা | কেন |
|---|---|---|
| দূরের ছোট কৃষক / ব্যবসায়ী | সবচেয়ে বেশি ঠকেন | ধরে রাখা ও পরিবহনের সব খরচ তাঁর, দাম আগেভাগে নিশ্চিত করার উপায় নেই, বিমা নেই, হয় বেচতে হবে নয়তো দ্বিগুণ টেনে নিতে হবে। সময়সীমা দরকষাকষির জোর কেড়ে নেয়। |
| ঢাকার কাছের দেরিতে আসা ক্রেতা | জেতেন | ধরে রাখার খরচ নেই, সময়সীমার চাপ নেই; শেষ দিনের দরপতন পর্যন্ত অপেক্ষা করে অর্ধেক দামে কিনে নিতে পারেন। |
| ইজারাদার | জেতেন | দাম যা-ই হোক, প্রতিটি বিক্রিতে হাসিল আদায় করেন। ২০২৬ সালে ঢাকার বেশিরভাগ হাটের ইজারা গেছে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত দরদাতাদের হাতে। |
| বেপারি / মধ্যস্বত্বভোগী | মাঝামাঝি | খামার-গেট আর হাটের দামের ফারাকটা পান, তবে অবিক্রীত পশুর শেষ-দিনের পতনেও তাঁরা ঝুঁকিতে থাকেন। |
| সিটি করপোরেশন | জেতে | বিক্রেতার মৌসুম যেমনই কাটুক, ইজারার রাজস্ব আগেই ঘরে তোলা হয়ে যায়। |
| শহুরে ভোক্তা | মাঝামাঝি | দেরিতে আসা ক্রেতা সস্তায় পান; আগেভাগে আসা বা অনভিজ্ঞ ক্রেতা চোখের দামে বেশি দেন। |
| পশু | ঠকে | গরম আর ভিড়ের মধ্যে কয়েক দিন, পানিশূন্যতা, ধকল, আর সময়সীমার জন্য পণ্য হয়ে আটকে থাকার যন্ত্রণা। |
হাসিল, অর্থাৎ হাটের টোল, দেখিয়ে দেয় বিজয়ীরা কতটা নিরাপদ। এটা বিক্রয়মূল্যের ৫ শতাংশে বাঁধা, আর দেন ক্রেতা; ২ লাখ টাকার একটা গরুতে টোল প্রায় ১০,০০০ টাকা। বিক্রেতা লাভ করুন বা লোকসান, ইজারাদার প্রতিটি লেনদেনেই তা তুলে নেন। আর ইজারাগুলো নিজেই এক-একটা পুরস্কার: ২০২৬ সালে ঢাকার অস্থায়ী হাটগুলোর বেশিরভাগ গেছে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত দরদাতাদের হাতে; শুধু বউবাজার-দিয়াবাড়ি হাটই ৮.৩০ কোটি টাকা ভিত্তিমূল্যের বিপরীতে গেছে ১৪.১৫ কোটি টাকার দরে। যারা হাট চালায়, তারা টাকা পায় সবার আগে আর নিশ্চিতভাবে। কৃষক পান সবার শেষে আর সবচেয়ে কম।
যে অপচয় ব্যবস্থা নিজেই বানায়
কৃষকের পকেট থেকে ক্রেতার পকেটে এই সম্পদ সরে যাওয়ার বাইরেও, হাট-ব্যবস্থা সরাসরি মূল্য নষ্ট করে। ঈদের সময় প্রায় ১.৫ কোটি মানুষ পথে নামে আর প্রায় ১ কোটি পশু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায়, যার বড় অংশ ছোটে ঢাকার দিকে; সারা দেশে যেখানে প্রায় ৩,৫০০টি হাট, সেখানে ঢাকাতেই বসে আনুমানিক ২৬ থেকে ২৭টি অস্থায়ী ও স্থায়ী হাট। যে পশুগুলো বিক্রি হয় না, তাদের পুরো পথটা পাড়ি দিতে হয় দুবার। লোকসানে কিংবা একেবারেই বিক্রি না হওয়া পশুকে খাওয়ানো, পাহারা দেওয়া আর টেনে নেওয়ার শ্রম মূলত মূল্য কমানোর পেছনে খরচ হওয়া কর্মঘণ্টা। শুধু রাজধানীর বর্জ্য সরানোর কাজেই লাগে হাজার হাজার শ্রমিক: ২০২৬ সালে কোরবানির পশুর বর্জ্য পরিষ্কারে ঢাকা নামিয়েছে ২৯,৫০০ জনকে।
পশুরাও এর দাম দেয়। ঢাকার হাট থেকে আসা প্রতিবেদন বলছে, পশুদের বাঁশের খুঁটির সঙ্গে এত শক্ত করে বাঁধা হয় যে তারা বসতেও পারে না, খোলা রোদে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকিতে ফেলে রাখা হয়, আর কেবল সবচেয়ে দামি পশুর ভাগ্যেই জোটে টিনের ছায়া; এ বছর টানা বৃষ্টিতে নিষ্কাশনহীন হাট জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে, ষাঁড় দাঁড়িয়ে থাকে জমে থাকা পানিতে। কয়েক দিনের গরম, তৃষ্ণা আর ধকল শুধু পশুকল্যাণের প্রশ্ন নয়। এটা ওই পশুরই হারিয়ে যাওয়া ওজন, যে ওজন কেউ মাপলে সেটাই তার দাম ঠিক করে দিত।
সমাধান মেলে কেজিতে
পশুর দাম ঠিক করার একটা ভালো উপায় আছে, আর বাংলাদেশ ছোট পরিসরে সেটা ব্যবহারও করছে। জ্যান্ত ওজনে বেচাকেনা, অর্থাৎ চোখের আন্দাজে নয়, বরং ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে মাপা শরীরের ওজনে গরু বিক্রি, মহামারির পর থেকে দ্রুত ছড়িয়েছে। চট্টগ্রামে খামারগুলো এখন হাটেই পশু ওজন করে, আর দেশি গরুর দাম হাঁকে জ্যান্ত ওজনে কেজিপ্রতি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। যে মডেলটা গড়ে উঠেছে, তা পশু রাখার জায়গা নেই এমন শহুরে ক্রেতার জন্য দারুণ: খামার ঈদের আগেই পশু ওজন করে বিক্রি করে দেয়, কোরবানির দিন পর্যন্ত নিজেই তার যত্ন নেয়, তারপর পৌঁছে দেয়।
জ্যান্ত ওজন সৎ থাকে কেবল তখনই, যখন মাংসে রূপান্তরের হারটা প্রকাশ করা থাকে। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ গরুর জ্যান্ত ওজনের প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ মাংস মেলে; চিকন জেবু-জাতের পশুতে আরও কম। এ কারণেই কেজিপ্রতি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকার জ্যান্ত দাম, বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে চালু থাকা ব্যাখ্যা অনুযায়ী, চামড়া-হাড়-নাড়িভুঁড়ি বাদ দিলে আসল মাংসে গিয়ে দাঁড়ায় কেজিপ্রতি প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। কেজি দরে দাম ক্রেতাকে তখনই রক্ষা করে, যখন তার সঙ্গে থাকে একটা স্বচ্ছ, প্রমিত মাংস-হার। সেটা না থাকলে "কেজি ৪৮০ টাকা" কথাটা চোখের আন্দাজের চেয়ে স্পষ্ট কিছু নয়। আর সেটা থাকলে দুই পক্ষ এমন একটা সংখ্যা নিয়ে দরাদরি করে, যেটা একটা ওজনযন্ত্রই মিটিয়ে দিতে পারে।
যা আমরা আগেই করে দেখিয়েছি
এটা কোনো কল্পনাবিলাস নয়। কোভিড-১৯-এর সময় সরকার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, আইসিটি বিভাগ আর ই-কমার্স সমিতির সঙ্গে মিলে, a2i-এর কারিগরি সহায়তায় একটা অনলাইন পশুর হাট গড়ে তোলে আর চালায়, নাম ছিল ডিজিটাল হাট। ক্রেতারা সরাসরি ভিডিওতে পশু দেখতেন, বাড়তি কোনো হাট-ফি ছাড়াই অনলাইনে কিনতেন, আর সবচেয়ে বড় কথা, টাকা দিতেন বাংলাদেশ ব্যাংকের একটা এসক্রোর মাধ্যমে, যেটা টাকা আটকে রাখত যতক্ষণ না পশু হাতে পাওয়া যায়; ফলে ক্রেতার পছন্দ করা পশুর বদলে অন্য পশু গছিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকত না।
এটা দ্রুত বড় হয়েছিল, তারপর মিইয়ে গেছে। ২০২০ সালে অনলাইনে প্রায় ২৭,০০০ পশু বিক্রি হয়; ২০২১ সালে প্ল্যাটফর্মের বিক্রি রেকর্ড ছোঁয় (মৌসুম শেষে সবচেয়ে বেশি যে সংখ্যাটা উদ্ধৃত হয় তা প্রায় ৩,৮৭,০০০, যা একটি ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কারে স্বীকৃতিও পায়), আর বিক্রির অঙ্কটা নির্ভর করত কে কখন গুনছে তার ওপর: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ১১ জুলাই ২০২১ পর্যন্ত ১.০৫ লাখেরও বেশি গরু, প্রায় ৭৩৭ কোটি টাকার, বিক্রির কথা জানায়; আর ই-কমার্স সমিতি এক সপ্তাহ পরে সব প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে গুনে সেটা দাঁড় করায় ২,৮৮,০৬৮টি পশুতে, মূল্য ১,৮৬৫ কোটি টাকা। ২০২২ সালে লকডাউন উঠে গেলে ডিজিটাল হাটের বিক্রি নেমে আসে প্রায় ৬০,০০০ পশুতে। শিক্ষাটা এই নয় যে অনলাইন ব্যর্থ হয়েছে। শিক্ষাটা হলো, চাপের মুখে এটা কাজ করেছিল, আর চাপ সরে যেতেই একে আর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়নি। রেললাইন বসানো হয়েছিল, তারপর তাতে মরচে ধরতে দেওয়া হয়।
অন্য দেশ কীভাবে দাম খুঁজে পায়
বড় প্রাণিসম্পদ-অর্থনীতির প্রতিটি দেশ অনেক আগেই দাম খোঁজার কাজটাকে পশু এক জায়গায় জড়ো করা থেকে আলাদা করে ফেলেছে, আর সেটাকে দাঁড় করিয়েছে ওজনের ওপর। অস্ট্রেলিয়ার AuctionsPlus বাণিজ্যিক গরু তালিকাভুক্ত করে কেবল তখনই, যখন একজন স্বীকৃত মূল্যায়নকারী বস্তুনিষ্ঠ ওজন আর অবস্থা-স্কোর লিখে রাখেন; এরপর পুরো পাল এক জায়গায় না এনেই অনলাইনে নিলামে তোলে। নিউজিল্যান্ডের bidr একই কারণে চালায় একটা ভার্চুয়াল সেলইয়ার্ড, স্পষ্টভাবেই পশুকে ট্রাকে তুলে শারীরিক বাজারে নেওয়ার ধকল, পরিবহন আর জৈব-নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে। যুক্তরাষ্ট্রে গরু বিক্রি হয় প্রত্যয়িত ওজনযন্ত্রে হান্ড্রেডওয়েট হিসেবে, যে যন্ত্রকে একটা জাতীয় নির্ভুলতা-মান মেনে চলতে হয় আর বছরে অন্তত দুবার পরীক্ষা করতে হয়, যা Packers and Stockyards Act-এর অধীনে বাধ্যতামূলক। ভারতের e-NAM আর তার মডেল কৃষি উৎপাদন ও প্রাণিসম্পদ বিপণন আইন বেচাকেনা চালায় শ্রেণিকৃত, ওজনকৃত আর ইলেকট্রনিকভাবে নিলামে তোলা লটের মধ্য দিয়ে; যদিও বাস্তবে e-NAM এখনো মূলত একটা ফসলের প্ল্যাটফর্মই, বড় পরিসরে গরুর জন্য তা প্রমাণিত নয়।
এই ব্যবস্থাগুলোর একটাও অদ্ভুত কিছু নয়, আর একটাতেও এমন কোনো প্রযুক্তি লাগে না যা বাংলাদেশের নেই। সবার ভেতরে একটাই অভিন্ন নীতি: দাম ঠিক হয় মাপা ওজনের বিপরীতে, আর দাম খুঁজে পেতে পশুকে কয়েক দিন বাজারে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না।
ছবির বাকি দিকগুলো
হাট কেন টিকে আছে, সেটা না বুঝে যে সংস্কার আসবে, তার ব্যর্থ হওয়াই উচিত। কোরবানির আগে বেছে নেওয়া আর নিজ চোখে দেখা জ্যান্ত পশুর সঙ্গে এমন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য জড়িয়ে আছে, যা কোনো স্প্রেডশিটে ধরা পড়ে না; বহু পরিবারের কাছে হাটে যাওয়া, পশু পরখ করা, দরাদরি করা, এসবই ইবাদতের অংশ, কাটছাঁট করে সরিয়ে দেওয়ার মতো অদক্ষতা নয়। হাট একটা কর্মসংস্থানের অর্থনীতিও: ব্যবসায়ী, রাখাল, পরিবহনকর্মী, খাবার-বিক্রেতা আর শ্রমিক, সবাই ওই এক সপ্তাহে আয় করেন। আগে ওজন করা, প্রক্রিয়াজাত মাংসে পুরোপুরি সরে যাওয়া শিগগিরই সম্ভব নয়, আর জোর করে চাপিয়ে দেওয়াও উচিত নয়। বাংলাদেশ ইচ্ছা করেই অনানুষ্ঠানিকভাবে জবাই করে: দেশের প্রায় ৯৩ শতাংশ মাংস চলে অনানুষ্ঠানিক পথে, প্রায়ই কোনো হিমাগার ছাড়াই; প্রায় ৬৩ শতাংশ কসাইয়ের দোকানে ফ্রিজ নেই; আর রপ্তানি-মানের প্রক্রিয়াজাতকারী বলতে কার্যত একটাই, Bengal Meat, প্রতি শিফটে প্রায় ২২ টন। ঠান্ডা মাংসের চাহিদা পাতলা। গোটা দেশের রূপান্তর সামলানোর মতো কোল্ড চেইন স্রেফ নেই।
জ্যান্ত ওজনও কোনো জাদুর সংখ্যা নয়। ওজন করার ঠিক আগে পশুকে বেশি খাইয়ে-পানি খাইয়ে পেট ভরিয়ে দিয়ে ওজন বাড়িয়ে দেখানো যায়, তাই বিশ্বাসযোগ্য একটা ব্যবস্থায় শুধু ডিজিটাল রিডিং নয়, দরকার একটা উপবাস বা শ্রিংক-নিয়ম আর একটা সম্মত মাংস-হারের ব্যান্ড। আর প্রকাশিত মাংস-হার তো একটা গড়; নির্দিষ্ট কোনো পশু মানের চেয়ে মোটা বা চিকন হতেই পারে। সৎ দাবিটা সংকীর্ণ, কিন্তু জোরালো: স্বচ্ছ রূপান্তরসহ ওজন দরে দাম চোখের আন্দাজের চেয়ে বেশি নির্ভুল, বেশি যাচাইযোগ্য আর কম শোষণযোগ্য, আর এর জন্য কাউকে জ্যান্ত কোরবানি ছাড়তে হয় না। এটা পশুর দাম কীভাবে ঠিক হয় তা বদলায়, কোরবানি হবে কি না, তা নয়।
যা সমস্যাটা মেটাবে
সংস্কার মানে হাট তুলে দেওয়া নয়। সংস্কার মানে বস্তুনিষ্ঠ দাম-নির্ধারণ আর দূর থেকে দাম খুঁজে পাওয়াকে নিয়মে পরিণত করা, যাতে কৃষককে শেষ কয়েকটা দিন ঢাকায় দাঁড়িয়ে তাঁর লাভটুকু জুয়ায় না হারাতে হয়। পাঁচটা পদক্ষেপই বেশিরভাগ কাজ সেরে দেবে।
প্রথমত, একটা প্রকাশিত জ্যান্ত-ওজন ও মাংস-হার মান, যার যৌথ মালিক হবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর আর চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কোনো ভেটেরিনারি কর্তৃপক্ষ; সঙ্গে থাকবে একটা উপবাস বা শ্রিংক-নিয়ম, যাতে ওজন বাড়িয়ে দেখানো না যায়, আর একটা হার-ব্যান্ড, যা জ্যান্ত কেজিকে মাংসে রূপান্তর করে দেবে। এটাই সবচেয়ে সস্তা পদক্ষেপ, আর বাকি সবকিছু এর ওপরই দাঁড়ায়।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি স্থায়ী আর অস্থায়ী হাটে প্রত্যয়িত ওজন-সেতু, যা একটা প্রকাশিত নির্ভুলতা-মান মেনে চলবে আর নির্দিষ্ট সময়সূচি ধরে পরীক্ষা করা হবে, যুক্তরাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক ওজনযন্ত্র নিয়মের আদলে। গেটে একটা ওজনযন্ত্র থাকলে সাহসের লড়াই বদলে যায় একটা মাপে।
তৃতীয়ত, ডিজিটাল হাট যে রেললাইন আগেই প্রমাণ করে গেছে, তার ওপর গড়ে তোলা নিয়ন্ত্রিত অনলাইন ও নিলামভিত্তিক দাম-নির্ধারণ, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের এসক্রো থাকবে মান হিসেবে; যাতে চুয়াডাঙ্গার এক কৃষক পশুকে অনুমানের ভরসায় ঢাকায় না এনেই ঢাকার এক ক্রেতার কাছে বেচতে পারেন।
চতুর্থত, খামার-গেটে ওজন করে ধরে রাখার একটা বিকল্প, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে আর প্রচার করে, যাতে পশু খামারেই ওজন করা, বিক্রি করা আর যত্ন করা হয়, তারপর কোরবানির দিন পৌঁছে দেওয়া হয়; বর্তমান ব্যবস্থার তৈরি করা সেই দ্বিগুণ টানাটানি আর গরমে দাঁড়িয়ে থাকার দিনগুলো এতে আর থাকে না।
পঞ্চমত, হাসিল ও ইজারা সংস্কার: রাজনৈতিকভাবে যুক্ত ইজারাদারদের তোলা বাড়তি ভাড়া ভাঙতে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলকভাবে দেওয়া ইজারা, আর নির্ধারিত ৫ শতাংশ টোলের বেশি আদায়ের বিরুদ্ধে কঠোর প্রয়োগ; যাতে হাট যারা চালায়, তারাই একমাত্র নিশ্চিত বিজয়ী না হয়।
এটা কী, আর কী নয়
এটা কোরবানি বন্ধের ডাক নয়, জ্যান্ত পশুকে শ্রিংক-র্যাপে মোড়া গরুর মাংসের ট্রে দিয়ে বদলে দেওয়ার ডাকও নয়। কোরবানিই মূল কথা, আর তা থাকবে এবং থাকা উচিত পরিবারের নিজ হাতে বেছে নেওয়া একটা জ্যান্ত পশুই। এটা ডাক সেই পশুকে চোখের আন্দাজে দাম দেওয়া বন্ধের, আর কৃষককে ঢাকার বাজারে সময়সীমা তাঁকে ভেঙে ফেলা পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে দাম খুঁজতে বাধ্য করা বন্ধের। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মে ২০২৬-এই বলেছেন, জ্যান্ত-ওজন দামে গেলে লেনদেন "আরও স্বচ্ছ ও প্রমিত" হবে। প্রযুক্তি আছে, দেশের নিজের ডিজিটাল হাটে নজিরও আছে, আর যে মান একে ভিত্তি দেবে, তা মাত্র একটা দলিলের দূরত্বে। পরের বার যখন সময়সীমা এক কৃষকের অর্ধেক দাম কেড়ে নেবে, প্রশ্নটা এই থাকবে না যে বাংলাদেশ পশুটাকে ওজন করতে পারত কি না। পারত। প্রশ্নটা থাকবে, রেললাইন বসিয়ে আর পদ্ধতি প্রমাণ করে দেওয়ার পরও কেন সে এখনো হাটকে কৃষককে খেতে দেয়।
সূত্র
- The Business Standard: শেষ দিনে ঢাকার হাটে গরুর দাম ৫০%-এর বেশি পতন -- শেষ দিনের দরপতন, ব্যবসায়ীদের বর্ণনা, ২৭ মে ২০২৬
- The Business Standard: গাবতলীর ব্যবসায়ীরা লোকসানের আশঙ্কায় -- ফেরত পরিবহন ও লালন-পালন খরচ, ২৭ মে ২০২৬
- The Daily Star: জিলহজের চাঁদ দেখা গেছে, বাংলাদেশে ঈদুল আজহা ২৮ মে -- ঈদ ২০২৬-এর তারিখ
- BSS / TBS: ঈদের চাহিদা মিটিয়ে ২২.৭৩ লাখ পশু উদ্বৃত্ত -- DLS সরবরাহ/চাহিদা পদ্ধতি, ২০২৪
- The Business Standard: এই ঈদুল আজহায় ১.০৪ কোটির বেশি পশু কোরবানি -- ২০২৪-এর প্রকৃত কোরবানি ও প্রজাতি-ভাগ
- Xinhua: ঈদুল আজহায় বাংলাদেশে ৯১ লাখের বেশি পশু কোরবানি -- ২০২৫-এর প্রকৃত কোরবানি
- TBS ইনফোগ্রাফিক: ঈদুল আজহা ২০২৬, কত পশু প্রস্তুত -- ২০২৬-এর সরবরাহ ও চাহিদা
- DLS: Livestock Economy at a Glance 2023-24 -- গবাদিপশুর সংখ্যা, প্রাণিসম্পদের জিডিপি হিস্যা
- The Daily Star: কোরবানির অর্থনীতি -- ১ লক্ষ কোটি টাকার কর্মকাণ্ডের অনুমান
- The Daily Star: কোরবানির হাটে বাড়তি নয়, কেবল সরকার-নির্ধারিত হাসিল -- ৫% হাসিল, পরিবহন-টোল সতর্কতা
- The Daily Star: ঢাকার পশুর হাট, বড় অংশ পেলেন বিএনপি-সংশ্লিষ্ট দরদাতারা -- ২০২৬-এর ইজারা দর
- New Age: ঈদযাত্রা ও পশু পরিবহনে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরকারের হুঁশিয়ারি -- ১.৫ কোটি যাত্রী, ১ কোটি পশু পরিবহন
- The Daily Star: গাবতলী পশুর হাটের বিশৃঙ্খলা, সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য -- হাটে পশু-কল্যাণের অবস্থা
- Daily Sun: জীবিত-ওজন বাণিজ্য শতাব্দীপ্রাচীন গরু-বাণিজ্যকে বদলে দিচ্ছে -- জীবিত-ওজনের দাম, মাংস-হার, মানকাঠামোর আহ্বান
- The Veterinary Journal (PMID 25648775): গরুর ওজনে চাক্ষুষ বনাম বুকের-বেড় অনুমান -- চাক্ষুষ অনুমানের ভুল
- The Daily Star: অনলাইন গরু বিক্রির জোয়ার -- ডিজিটাল হাট ২০২১, এসক্রো, DLS হিসাব
- FAO Digital Village: Digital Haat -- ডিজিটাল হাটের পশু-সংখ্যা ২০২০-২০২২
- AuctionsPlus (অস্ট্রেলিয়া) -- স্বীকৃত মূল্যায়ন, অনলাইন নিলাম
- bidr (নিউজিল্যান্ড) -- ভার্চুয়াল সেলইয়ার্ড
- USDA AMS: প্রত্যয়িত ওজন-যন্ত্র ও প্রাণিসম্পদ ওজন, Packers and Stockyards Act -- প্রত্যয়িত ওজন-যন্ত্রের মান
- World Bank: বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতে জ্বালানি-সাশ্রয়ী কুলিং -- ৯৩% অনানুষ্ঠানিক মাংস, দুর্বল কোল্ড চেইন
- New Age: নিরাপদ পশুর হাটে সরকারের সর্বাত্মক ব্যবস্থা, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী -- জীবিত-ওজন দাম নিয়ে মন্ত্রী, মে ২০২৬