সারসংক্ষেপ। বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত সুযোগ ভবিষ্যতের বিষয় নয়, এটি ১৯৯১ সাল থেকে চলছে এবং ইতিমধ্যে অর্ধেক ব্যয় হয়ে গেছে। কর্মক্ষম বয়সীদের অনুপাত ২০৩১ সালে শীর্ষে পৌঁছাবে, তারপর গাণিতিক নিশ্চয়তায় কমতে থাকবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে নাগরিক ১ কোটি থেকে বেড়ে ৩ কোটি হবে। নারী শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ২০২২ সালের ৪৩.৭ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে নেমে এসেছে ৩৮.৭ শতাংশে (বিশ্ব ব্যাংকের মডেলকৃত ILO হিসাব), অর্থাৎ প্রায় পাঁচ শতাংশ পয়েন্টের পতন; বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রম জরিপে এক বছরে ১৭ লাখ নারী শ্রমশক্তি থেকে ছিটকে গেছেন। সর্বজনীন পেনশন স্কিমে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মাত্র ৪ লাখ গ্রাহক আছেন, যেখানে লক্ষ্য ১০ কোটি। আগামী ২৪ মাসে তিনটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত না নিলে ২০৪৫ সালে দেশ "ধনী হওয়ার আগেই বুড়ো" হওয়ার পথে যাবে।
আজ থেকে আঠারো বছর পরে, ২০৪৪ সালের কোনো এক বুধবার সকালে, আজকের ছয় বছর বয়সী একটি শিশু চাকরিতে যোগ দেবে।
সেই দিনটিই বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত সুযোগের শেষ দিন।
আমরা যাকে ত্রিশ বছর ধরে "ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড" বলে আসছি, যেন একটি ভবিষ্যতের সম্পদ, সেটা আসলে ভবিষ্যতের সম্পদ না। সেটা ১৯৯১ সালে শুরু হওয়া একটা সুযোগ, যার অর্ধেক ইতিমধ্যে ব্যয় হয়ে গেছে। ভুলটা একটি শব্দে। এই ভুল শব্দ বদল না করলে নবম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ভুল ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।
১৯৯১ সালের আদমশুমারিতে বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যা (১৫ থেকে ৬৪ বছর) ছিল মোট জনসংখ্যার ৫১.৬ শতাংশ। ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০.৭ শতাংশে। জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিভাগের মাঝারি ধারণা অনুসারে এই অনুপাত ২০৩১ সালে ৬৭ শতাংশে পৌঁছাবে। তারপর গাণিতিক নিশ্চয়তায় কমতে থাকবে। ২০৫০ সালে অনুপাত ৬০ শতাংশে ফিরে আসবে, কিন্তু ভেতরের গঠন অচেনা হবে: ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে নাগরিকের সংখ্যা ১ কোটি থেকে বেড়ে ৩ কোটি হবে।
এই বদল কোনো রহস্য না। ২০৪০-এর প্রবীণরা আজ বেঁচে আছেন। তাঁরা বর্তমানের ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী মানুষ। তাঁদের সংখ্যা গণনা করা যায়। তাঁদের জন্য ২০৪০ সালে কী লাগবে তা আজ থেকেই হিসাব করা যায়।
হিসাবটা ভয়াবহ। আজকের সর্বজনীন পেনশন স্কিমের গ্রাহক প্রায় ৪ লাখ (জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য, জুন ২০২৫), অর্থাৎ লক্ষ্যকৃত ১০ কোটির ০.৫ শতাংশের কম। ২০৪৫ সালে বয়স্ক ভাতা সব বয়স্ককে দিতে হলে যে বার্ষিক ব্যয় হবে, তা আজকের বরাদ্দের কয়েকগুণ।
দুইটা সংখ্যা পাশাপাশি রাখলে গল্পটা স্পষ্ট হয়। প্রবীণের সংখ্যা তিনগুণ হবে আঠারো বছরে। তাঁদের জন্য পেনশন কাঠামো বিদ্যমান এক ভাগের কম। মাঝখানে যা থাকার কথা ছিল, প্রস্তুতি, তার নাম শূন্য।
নীরব বিপ্লব, নীরব পতন
এই গল্পের সঙ্গে আরও একটি ঘটনা সমান্তরালে চলছে যা বেশিরভাগ মানুষ লক্ষ্য করেননি।
নারী শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ১৯৯০ সালে ছিল ২৪.২ শতাংশ। ৩২ বছর ধরে ধাপে ধাপে বেড়ে ২০২২ সালে পৌঁছায় ৪৩.৭ শতাংশে। এই ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে নীরব বিপ্লব। গার্মেন্টস কারখানা, উপজেলা শহরের শিক্ষিকা, গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতা, এনজিও ফিল্ডকর্মী, ঢাকার আইটি অফিস, প্রতিটি জায়গায় নারী শ্রমিক ঢোকার তিন দশকব্যাপী ঢেউ।
তারপর তিন বছরে প্রায় পাঁচ শতাংশ পয়েন্ট কমে এসে ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ৩৮.৭ শতাংশে (বিশ্ব ব্যাংকের মডেলকৃত ILO হিসাব, SL.TLF.CACT.FE.ZS: ২০২২ সালে ৪৩.৭ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৩৮.৭ শতাংশ)। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের শ্রম জরিপে নারী শ্রমশক্তি দুই কোটি ৫৩ লাখ থেকে নেমে এসেছে দুই কোটি ৩৭ লাখে, এক বছরে ১৭ লাখের পরম পতন, যা ২০১০ সালের পর প্রথম এমন পরিমাণের সংকোচন।
পতনের কারণ অজানা না। কোভিড-পরবর্তী পোশাক উপখাতে উপ-চুক্তিভিত্তিক ও বাড়িভিত্তিক সেলাই কাজের দীর্ঘ পুনরুদ্ধার-অসমাপ্ততা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় কারখানা বন্ধ হওয়া (সংখ্যা সঠিক হিসাবে এখনো বিতর্কিত, BGMEA ও BKMEA-এর সদস্য তালিকার তুলনায় কয়েক ডজন থেকে শতাধিক ইউনিট কমেছে)। এবং ২০২৩ সালের নভেম্বরে পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি ৮,০০০ থেকে ১২,৫০০ টাকায় (৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি) উন্নীত হওয়ার পরে কাটিং ও ফিনিশিং পর্যায়ে স্বয়ংক্রিয়করণে বিনিয়োগ ত্বরান্বিত হওয়া।
স্বয়ংক্রিয় কাটিং প্রযুক্তি যেহেতু কাটিং রুমের কাজগুলো সরিয়ে দেয়, এবং সেই কাজগুলো ঐতিহাসিকভাবে নারীপ্রধান, তাই প্রতিটি স্বয়ংক্রিয়করণ চক্র নারী কর্মসংস্থানে অসমভাবে আঘাত করে। নতুন উচ্চতর-দক্ষতার পদগুলো (গুণগত পরিদর্শন, যন্ত্র মনিটরিং) পলিটেকনিক ও NSDA-এর প্রশিক্ষণ পাইপলাইন থেকে আসে, যেগুলো ৭০ শতাংশের বেশি পুরুষ-ভিত্তিক। অর্থাৎ প্রযুক্তি যে কাজ মুছছে সেগুলো নারীর, যে কাজ যোগ করছে সেগুলো পুরুষের। এটা প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ পরিবর্তন না, এটা লিঙ্গ-অসম পরিবর্তন।
পাঁচ পয়েন্টের পতনের আকার যথেষ্ট বড়। এক বছরে শ্রমশক্তি থেকে ছিটকে যাওয়া ১৭ লাখ নারী মানে ১৭ লাখ পরিবারে একটি আয়ের উৎস বন্ধ এবং সমপরিমাণ উৎপাদনশীল শ্রম অর্থনীতির বাইরে। এই পতন একটানা চললে, কেবল এই কারণেই, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের অবশিষ্ট ১৮ বছরের প্রবৃদ্ধি অবদান লক্ষণীয়ভাবে কমবে, কারণ যে বছরগুলোতে কর্মক্ষম অনুপাত শীর্ষে থাকার কথা সেই বছরগুলোতেই কর্মক্ষম নারীরা বেরিয়ে যাচ্ছেন।
এই দুই ঘটনা, পেনশন প্রস্তুতির অভাব আর নারী শ্রমশক্তির পতন, একই কাঠামোগত সমস্যার দুই মুখ। দুটোই সময়-সংবেদনশীল। দুটোতেই দেরি করার দাম দ্রুত বাড়ে।
ছয়টি কাজ, একটি সংকীর্ণ জানালা
আঠারো বছর কম সময় মনে হতে পারে। কিন্তু এই সময়টায় বাংলাদেশকে ছয়টি কাজ একসঙ্গে করতে হবে। প্রতিটি কাজ অন্য দেশে পরীক্ষিত। প্রতিটিই বাংলাদেশে রাজনৈতিক ব্যয়সাপেক্ষ, কিন্তু এ কাজগুলো না করার মূল্য, যা বাজেটে দেখা যায় না, প্রতিটি ক্ষেত্রে অনেক বেশি।
প্রথম, নারী শ্রমশক্তির পুনরুদ্ধার, শিশু পরিচর্যা থেকে শুরু করে। বর্তমানে ০ থেকে ৫ বছরের শিশুদের জন্য পাবলিক চাইল্ডকেয়ার কভারেজ ১ শতাংশের নিচে, যা নিম্ন-মধ্যম আয়ের এশিয়ায় সর্বনিম্ন। ভিয়েতনামের শ্রম আইনে নির্দিষ্ট সংখ্যক নারী কর্মচারীর প্রতিষ্ঠানের জন্য কর্মস্থল-সংলগ্ন শিশু পরিচর্যা সহায়তা বাধ্যতামূলক, এবং ভিয়েতনাম শিক্ষাগত সমতাকে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণে রূপান্তর করতে পারা গুটিকয় এশীয় দেশের একটি (IMF Finance & Development, ২০১৮)। বাংলাদেশে ২০০-এর বেশি নারী কর্মচারীর প্রতিষ্ঠানের জন্য (প্রায় ১,৪০০ পোশাক কারখানা ও ৬০০ অন্যান্য বড় শিল্প) একই বাধ্যবাধকতা প্রয়োগ করা যেতে পারে। দায়িত্ব: শ্রম মন্ত্রণালয়। সাফল্যের পরিমাপযোগ্য সংকেত: তিন বছরে ২০০+ নারী-কর্মী প্রতিষ্ঠানে কর্মস্থল শিশু পরিচর্যা চালুর হার এবং ওই কারখানাগুলোতে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ পুনরুদ্ধার।
দ্বিতীয়, ১৯৭৬ সালের শ্রম আইনের ১০৯ ধারার সংস্কার। বর্তমানে নারী শ্রমিকদের রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কারখানার কাজে নিষেধাজ্ঞা আছে, যা ছিল মূলত সুরক্ষা বিধান, কিন্তু বাস্তবে এটি সান্ধ্য পালির পোশাক উৎপাদনকে সীমিত করে, যেটি রপ্তানি খাতের সবচেয়ে শ্রমঘন পালি। সম্মতির ভিত্তিতে এবং পরিবহন ও নিরাপত্তা বাধ্যতামূলক করে এই ধারার সংস্কার সুরক্ষাকে বাদ দিয়ে নয়, সুরক্ষাকে কঠিন শর্ত হিসেবে যুক্ত করে প্রভাবিত কারখানায় নারী সান্ধ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে পারে। দায়িত্ব: শ্রম মন্ত্রণালয় ও সংসদ। সাফল্যের পরিমাপযোগ্য সংকেত: সংশোধনী পাশ এবং পরিবহন-নিরাপত্তা শর্ত মেনে সান্ধ্য পালিতে নারী নিয়োগের প্রতিষ্ঠান-সংখ্যা।
তৃতীয়, পেনশন স্কিমের ডিফল্ট নিবন্ধন। Universal Pension Management Act ২০২৩-এর ১২ ধারা স্পষ্ট অনুমতি দেয়: "সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে যেকোনো শ্রেণীর নাগরিক বা কর্মচারীর জন্য যেকোনো স্কিমে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে পারে।" এই কর্তৃত্ব এখনো প্রয়োগ হয়নি। আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মচারীদের জন্য ডিফল্ট নিবন্ধন প্রয়োগ করলে গ্রাহক সংখ্যা বছরে কয়েক লাখ থেকে কোটির অংকে পৌঁছাতে পারে। বর্তমান গতি (মাসে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার নতুন গ্রাহক) চলমান থাকলে, লক্ষ্যকৃত ১০ কোটি গ্রাহকে পৌঁছাতে যে সময় লাগবে তা প্রায়োগিক অর্থে অসম্ভব। দায়িত্ব: অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। সাফল্যের পরিমাপযোগ্য সংকেত: ১২ ধারার গেজেট প্রজ্ঞাপন এবং আনুষ্ঠানিক খাতে নিবন্ধিত গ্রাহকের মাসিক বৃদ্ধির হার।
চতুর্থ, ক্ষমতা পরিশোধের পুনরালোচনা। স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদকদের (IPP) ক্ষমতা পরিশোধে FY 2023-24-এ আনুমানিক ২৮ থেকে ৩২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ২০২৪ সালের পরবর্তী সরকার ঘোষণা দিয়েছে যে চুক্তি নবায়নে আর ক্ষমতা পরিশোধের ধারা থাকবে না। এই নীতিগত প্রতিশ্রুতি যদি ২০২৬-২৭ এর চুক্তি মেয়াদোত্তীর্ণ চক্রে ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা হয়, তবে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার অংকে সাশ্রয় সম্ভব, যা বার্ষিক বয়স্ক ভাতা সম্প্রসারণের একটি বড় উৎস হতে পারে। অর্থাৎ পেনশন তহবিলের একটা প্রধান উৎস ইতিমধ্যেই বাজেটের ভেতরে আছে, শুধু পুনর্বিন্যাস দরকার। দায়িত্ব: বিদ্যুৎ বিভাগের চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি ও অর্থ মন্ত্রণালয়। সাফল্যের পরিমাপযোগ্য সংকেত: ক্ষমতা-চার্জমুক্ত শর্তে নবায়িত চুক্তির সংখ্যা এবং বছরে ক্ষমতা পরিশোধ বাবদ মোট টাকার পতন।
পঞ্চম, NSDA-এর বাজেটের ৩০ শতাংশ চাহিদা-ভিত্তিক শিক্ষানবিশীতে স্থানান্তর। National Skills Development Act ২০১৮-এর ৮ ধারায় কর্তৃত্ব আছে, কিন্তু বাজেটিং অনুশীলন বদলায়নি। নিয়োগকারীর অর্থায়িত খাত-ভিত্তিক দক্ষতা তহবিল প্রয়োগ করলে যুবদের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান শোষণ হার বাড়বে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের শ্রম জরিপ অনুযায়ী স্নাতক স্তরে বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশ, যা সব শিক্ষাস্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং NSDA-এর বিদ্যমান প্রশিক্ষণ-চাকরি অমিলের সরাসরি লক্ষণ। দায়িত্ব: NSDA গভর্নিং বডি। সাফল্যের পরিমাপযোগ্য সংকেত: চাহিদা-ভিত্তিক শিক্ষানবিশীতে বরাদ্দের অনুপাত এবং প্রশিক্ষণ-পরবর্তী আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে নিয়োগের হার।
ষষ্ঠ, BBS-এর জনগণনা ২০২২-এর মাইক্রোডাটা প্রকাশ। ৯ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (FY 2026-27 থেকে FY 2030-31) প্রস্তুতিতে ২০২২-এর মাইক্রোডাটা ছাড়া ২০১১-এর তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হলে পরিকল্পনার শেষে তথ্য বাইশ বছরের পুরোনো হবে। IPUMS-International-এ এক্সট্র্যাক্ট প্রস্তুত করা ১৪ থেকে ১৮ মাসের কাজ, বিদ্যমান BBS বাজেট থেকে অর্থায়নযোগ্য। দায়িত্ব: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। সাফল্যের পরিমাপযোগ্য সংকেত: ২০২২ মাইক্রোডাটার প্রকাশ-তারিখ এবং নবম পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা এতে ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়েছে কিনা। এই একটি পদক্ষেপ ছাড়া বাকি পাঁচটির লক্ষ্য নির্ধারণ ঠিকঠাক হবে না।
ভিয়েতনাম, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, কম্বোডিয়া
পাঠক যদি ভাবেন এই প্রস্তাবগুলো নতুন আবিষ্কার, সেটা ভুল। প্রতিটি অন্য দেশে দেখা গেছে। ভিয়েতনাম, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, কম্বোডিয়া, এই উদাহরণগুলো বাংলাদেশের নীতি আলোচনায় আসে, কিন্তু পরিকল্পনার ভাষায় আসে না।
আমরা যাকে "ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড" বলি, সেই ১৯৯১-২০৩১ চক্রটি কোরিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড, চীন, ভিয়েতনাম প্রত্যেকেই পার করেছে। কিন্তু একটি মৌলিক পার্থক্য আছে: পূর্ব এশিয়ার বাঘেরা যখন তাদের কর্মক্ষম-অনুপাতের শীর্ষে ছিল তখন তাদের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের আজকের ও ২০৩১-এর প্রকল্পিত আয়ের তুলনায় অনেক উঁচুতে ছিল। বাংলাদেশ একই জনসংখ্যাগত শীর্ষ পার করছে অনেক নিচু আয়স্তর থেকে।
অর্থাৎ একই জনসংখ্যাগত পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ অপেক্ষাকৃত গরিব অবস্থায় বেরিয়ে আসবে। সেই দরিদ্রতার মধ্যে প্রবীণদের সংখ্যা তিনগুণ হবে, এবং সেই প্রবীণদের জন্য যে পেনশন কাঠামো ইতিমধ্যে দাঁড় করানো উচিত ছিল, সেটি এখনো প্রায় শূন্য। এই পার্থক্যটাই 'ধনী হওয়ার আগেই বুড়ো' হওয়ার পরিভাষাগত গল্প।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ভূমিকায় বলা হয়েছিল, "বাংলাদেশ একটি ঐতিহাসিক জনসংখ্যাগত সুযোগের দ্বারপ্রান্তে।" এই বাক্যটি অর্ধেক সঠিক। বাংলাদেশ সুযোগটির দ্বারপ্রান্তে নয়, এর মাঝামাঝি অবস্থানে। নবম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা যখন তৈরি হবে ২০২৬ সালে, তখন এই পার্থক্যটা যদি স্বীকার করা হয় ভাষায় ও বিনিয়োগ অগ্রাধিকারে, তবে আগামী আঠারো বছর ভিন্নভাবে সাজানো সম্ভব। যদি স্বীকার না করা হয়, তবে ২০৪৫ সালে যাঁরা আজকের নবজাতক, তাঁরা একটি ভিন্ন বাংলাদেশ পাবেন: ধনী হওয়ার আগেই বুড়ো হয়ে যাওয়া দেশ, যেখানে জাতীয় বাজেটের সবচেয়ে বড় চাপ হবে অপরিকল্পিত প্রবীণ ভাতা।
যে যুক্তিটি সবচেয়ে শক্ত
এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত আপত্তি হলো: কর্মক্ষম জনসংখ্যা যখন এখনো বাড়ছে এবং কর্মসংস্থানই প্রধান চ্যালেঞ্জ, তখন পেনশন ও বার্ধক্য কাঠামোয় বিনিয়োগ অকালপক্ব। আপত্তিটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি ঠিক উল্টো সিদ্ধান্তে নিয়ে যায়। পেনশন কাঠামোর মূল্য আসে সঞ্চয়ের সময় থেকে, প্রদানের সময় থেকে নয়। আজ যাঁরা ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী, তাঁরাই ২০৪৫ সালের প্রবীণ; তাঁদের কর্মজীবনের অবশিষ্ট বছরগুলোতেই চাঁদা জমা হওয়ার একমাত্র সুযোগ। জানালা যত দেরিতে খোলা হবে, প্রতিটি ভবিষ্যৎ প্রবীণের জন্য সঞ্চয়ের বছর তত কমবে এবং রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির চাপ তত বাড়বে।
সিদ্ধান্ত বদলে দেবে এমন তথ্য কী? যদি ২০২৬ সালের শ্রম জরিপে দেখা যায় নারী শ্রমশক্তির পতন থেমে গেছে এবং অংশগ্রহণ আবার ৪২ শতাংশের ওপরে উঠছে, তবে প্রথম ও দ্বিতীয় প্রস্তাবের জরুরিতা শিথিল হবে। আর যদি জনগণনা ২০২২-এর মাইক্রোডাটায় কর্মক্ষম অনুপাতের শীর্ষ ২০৩১-এর পরিবর্তে আরও পরে দেখা যায়, তবে গোটা সময়সূচি কিছুটা পেছানো যাবে। কিন্তু এই দুটির কোনোটিই বর্তমান তথ্যে দেখা যাচ্ছে না; বিপরীতে, পতন ও পেনশন-শূন্যতা দুটোই বাস্তব।
প্রশাসনিক জানালা
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে BNP সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এই নতুন সরকারের প্রথম বছর একটি সংকীর্ণ প্রশাসনিক জানালা। উপরের ছয়টি পদক্ষেপের কোনোটিই নতুন আইন দাবি করে না। প্রতিটি বিদ্যমান আইনের ধারায় পড়ে থাকা প্রশাসনিক ক্ষমতার অনুশীলন।
শিশু পরিচর্যা বাধ্যবাধকতা শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে সম্ভব। ১০৯ ধারার সংস্কার শ্রম আইনের সংশোধনী, যা সংসদে পাঠানো যায়। পেনশন ডিফল্ট নিবন্ধন UPMA ২০২৩-এর ১২ ধারার গেজেট প্রজ্ঞাপন। ক্ষমতা পরিশোধের পুনর্নেগোসিয়েশন পাওয়ার ডিভিশনের চুক্তি পর্যালোচনা কমিটির এখতিয়ারে। NSDA বাজেট পুনর্বরাদ্দ NSDA গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত। জনগণনা মাইক্রোডাটা প্রকাশ BBS-এর প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত।
ছয়টি সিদ্ধান্ত। ছয়টি স্বাক্ষর।
২০২৬ সালের মধ্যে এই ভিত্তি স্থাপন না হলে এই সংস্কারগুলো সংসদীয় বিতর্কের দীর্ঘ চক্রে পড়বে, যেখানে রাজনৈতিক ব্যয় কয়েকগুণ বেশি। বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত গণনা ২০৩১ সালের শীর্ষে অপেক্ষা করছে না। শীর্ষ আগেই চলে এসেছে বললে বাড়াবাড়ি হবে না।
আঠারো বছর পরের ছয় বছর বয়সী শিশু কাজে যাবে কোন বাংলাদেশে? ধনী হওয়ার আগেই বুড়ো বাংলাদেশে, যেখানে তার বেতন থেকে বড় অংশ বার্ধক্য ভাতায় কাটা হয়? নাকি প্রস্তুত বাংলাদেশে, যেখানে বার্ধক্য ভাতা গড়া হয়েছিল ৩০ বছর আগে, এবং সেই কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে?
জানালাটা বন্ধ হচ্ছে। অর্ধেক ইতিমধ্যে বন্ধ। বাকি অর্ধেক, ছয়টি স্বাক্ষরের।
বিস্তৃত তথ্যসূত্র, প্রতিটি সংখ্যার উৎস, এবং পাঁচটি হস্তক্ষেপের প্রতিটির বিস্তারিত যুক্তি ইংরেজি নীতিপত্র "The Half-Closed Window" থেকে পাওয়া যাবে।
লেখক: নীতিগবেষক, বিডিপলিসিল্যাব।
তথ্যসূত্র
- বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS), আদমশুমারি ২০২২ (প্রাথমিক প্রকাশনা, নভেম্বর ২০২৩): https://bbs.gov.bd/site/page/47856ad0-7e1e-4d84-afa1-b196b164c6de
- IPUMS International, বাংলাদেশ আদমশুমারি নমুনা ১৯৯১/২০০১/২০১১: https://international.ipums.org/international/
- জাতিসংঘ বিশ্ব জনসংখ্যা সম্ভাবনা ২০২৪, মাঝারি ধারণা (UN WPP 2024): https://population.un.org/wpp/Download/Standard/MostUsed/
- বাংলাদেশ জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০২২ (BDHS 2022): https://dhsprogram.com/data/dataset/Bangladesh_Standard-DHS_2022.cfm
- বিশ্ব ব্যাংক WDI, নারী শ্রমশক্তি অংশগ্রহণ হার (SL.TLF.CACT.FE.ZS, BGD ২০২২: ৪৩.৭%, ২০২৪: ৩৮.৭%): https://data.worldbank.org/indicator/SL.TLF.CACT.FE.ZS?locations=BD
- বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS), শ্রম জরিপ (LFS) ২০২৪, স্নাতক বেকারত্ব ১৩.৫% ও নারী শ্রমশক্তি ১৭ লাখ সংকোচন: https://bbs.gov.bd/site/page/labour-force-survey
- বাংলাদেশ জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ, UPS গ্রাহক তথ্য (জুন ২০২৫): https://npa.gov.bd
- সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৩, ধারা ১২: http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-1373.html
- পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি ৮,০০০ থেকে ১২,৫০০ টাকা (নভেম্বর ২০২৩, ৫৬% বৃদ্ধি): https://www.ilo.org/
- IPP ক্ষমতা পরিশোধ FY2023-24 আনুমানিক ২৮,০০০ কোটি টাকা: https://www.tbsnews.net/economy/budget/no-more-capacity-charge-rental-private-power-plants-when-renewing-contract-642026
- ভিয়েতনামের নারী শ্রমশক্তি ও পরিবারবান্ধব শ্রম আইন (IMF Finance & Development, সেপ্টেম্বর ২০১৮): https://www.imf.org/en/publications/fandd/issues/2018/09/female-labor-force-participation-in-vietnam-banerji