সারসংক্ষেপ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারেক রহমান সরকার (বিএনপি, শপথ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ৩৭০ কোটি ডলারের সার্বভৌম গ্যারান্টিযুক্ত বোয়িং চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, একটি অন্তর্বর্তী সরকারের ২৫-উড়োজাহাজ প্রতিশ্রুতি ১৪-তে নামিয়ে। বিমানকে জিজ্ঞেস না করে নেওয়া এই চুক্তির ৩৭০ কোটি ডলার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে তালিকা মূল্যে (list price) ধরা, অথচ ওয়াইডবডি অর্ডারে এয়ারলাইন্স সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ছাড় আদায় করে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হিসাবে বার্ষিক ঋণসেবা ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কোটি টাকা, যা বিমানের রেকর্ড বার্ষিক নিট মুনাফার (৭৮৫.২১ কোটি টাকা, ২০২৪-২৫) প্রায় দ্বিগুণ থেকে আড়াই গুণ। পাকিস্তান একই ধরনের শুল্ক-সুবিধা (১৯ শতাংশ) পেয়েছে কোনো উড়োজাহাজ না কিনেই।
৩০ এপ্রিল ২০২৬। ঢাকার একটি ছোট অনুষ্ঠানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আর বোয়িংয়ের প্রতিনিধিরা একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেন। ছবি ছাপা হলো, প্রেস রিলিজ গেল, সরকারি ভাষ্যে এটাকে বলা হলো বিমানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বহর সম্প্রসারণ।
বহর সম্প্রসারণ এটা না।
৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকার (৩৭০ কোটি ডলার) এই চুক্তিতে যা কেনা হলো, তা ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ। আটটি ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯, চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স। প্রথম ডেলিভারি ২০৩১, শেষটি ২০৩৫। ঋণ পরিশোধ চলবে ২০৪৫ পর্যন্ত। অর্থাৎ আজ যে শিশু স্কুলে যায়নি, সে যখন কর্মজীবনে ঢুকবে, তখন তার ট্যাক্স থেকে বিমানের নামে এই বিল কাটা হবে।
সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়েছিল আট সপ্তাহে। সংসদে আলোচনা হয়নি। বিমান বাংলাদেশের নিজস্ব বহর পরিকল্পনা কমিটি এই অর্ডারের কথা জানতে পেরেছে অর্ডার দেওয়ার পরে। যে প্রতিষ্ঠান বিমানগুলো চালাবে, তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি কোন বিমান লাগবে।
এই লেখাটি সেই আট সপ্তাহের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া এবং তার বিশ বছরের দাম নিয়ে।
তাড়াহুড়োর কারণ
পেছনের গল্প পরিচিত, কিন্তু ছোট হিসাবেই বলা হয়। জুলাই ২০২৫-এ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যে ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক ঘোষণা করে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় অংশই যায় পশ্চিমে: ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রায় ৫০ শতাংশ আর যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৯ শতাংশ, অর্থাৎ এই দুই বাজারেই প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। ৩৫ শতাংশ শুল্ক মানে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক রপ্তানি ঝুঁকি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়ার মডেল অনুসরণ করে ২৫টি বোয়িং কেনার প্রস্তাব পাঠায়। শুল্ক ২০ শতাংশে নামে। তারেক রহমান সরকার (বিএনপি, শপথ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ক্ষমতায় এসে অর্ডার ২৫ থেকে ১৪-তে নামালেন, শুল্ক আরও এক পয়েন্ট কমে ১৯ শতাংশে স্থির হয়।
ডিল হলো। কিন্তু এই ডিলের গঠন কারো অজানা না।
পৃথিবীর কোনো বড় উড়োজাহাজ সংস্থা আট সপ্তাহে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বহর সিদ্ধান্ত নেয় না। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স সাধারণত ১৮ থেকে ২৪ মাস ধরে বিকল্প যাচাই করে। এমিরেটসের বহর কমিটি প্রতিটি বড় অর্ডারে রুট-ভিত্তিক মুনাফা-লোকসানের সমতা বিন্দু হিসাব করে, প্রকৌশল সক্ষমতা যাচাই করে, একাধিক স্তরের বোর্ড অনুমোদন নেয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এই অর্ডার যখন গেল, তখন বিমানের নিজস্ব বহর পরিকল্পনা কমিটিকে এই সিদ্ধান্তের কথাই জানানো হয়নি। বিডিনিউজ২৪-এর প্রতিবেদনে বিমানের সাবেক বোর্ড সদস্যরা বলেছেন, অর্ডার দেওয়ার পর তাঁদের বলা হয়েছে: এই উড়োজাহাজগুলো তোমরা চালাবে।
এটা সংগ্রহ পদ্ধতি না। এটা একটা রাজনৈতিক চুক্তিতে উড়োজাহাজের তালিকা টেপ দিয়ে আটকানো।
দাম: যা দেওয়া হলো, যা দেওয়া উচিত ছিল
দামের গঠন সরকার নিজে ভেঙে দেখায়নি, কিন্তু একটি তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনেই আছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড লিখেছে, ৩৭০ কোটি ডলারের এই অঙ্ক তালিকা মূল্যে (at list prices) ধরা। এটাই মূল সমস্যা।
বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ বাজারে তালিকা মূল্যে কেউ কেনে না। শিল্প-বিশ্লেষণে দেখা যায়, বড় ওয়াইডবডি অর্ডারে প্রকৃত লেনদেন তালিকা মূল্যের চেয়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কম হয়; বহর-আকার, প্রতিযোগিতা আর অর্থায়নের শর্তের ওপর নির্ভর করে ছাড় আরও বেশিও হতে পারে। বোয়িং নিজে ২০১৮-র পর থেকে আর তালিকা মূল্য প্রকাশ করে না, কারণ প্রকৃত দাম এই প্রকাশিত সংখ্যা থেকে অনেক দূরে। অর্থাৎ যে সংখ্যায় চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো, সেটি আলোচনার শুরুর বিন্দু হওয়ার কথা ছিল, শেষ বিন্দু না।
প্রকৃত প্রশ্ন এক কথায়: একটি যথাযথভাবে আলোচিত চুক্তিতে বাংলাদেশের প্রতি ইউনিটে যে ছাড় আদায় করার কথা ছিল, তা আদায় হয়েছে কি? সরকার ইউনিট-প্রতি প্রকৃত দাম প্রকাশ না করায় ঠিক কত টাকা বেশি গেল তা বাইরে থেকে নির্ভরযোগ্যভাবে হিসাব করা যায় না। কিন্তু যা নিশ্চিত: তালিকা মূল্যে স্বাক্ষর করা মানে শিল্পের রীতিসম্মত বড় ছাড়ের সিংহভাগ ছেড়ে আসা। সরকার যদি প্রকৃত ইউনিট-দাম প্রকাশ করে, এই দাবি সহজেই খণ্ডন বা সমর্থন করা যাবে; সেই প্রকাশই প্রথম যাচাই।
দাম যদি একমাত্র সমস্যা হতো, তবু এই ক্ষতি গ্রহণ করা যেত। কিন্তু একটা দ্বিতীয় ভুল আরও বড়।
অর্ডারের মধ্যে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০, এই ভেরিয়েন্টটি পরিবারের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে দামি। বোয়িং ও ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের প্রকাশিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী এর সর্বোচ্চ পরিসর ৬,৩৩০ নটিক্যাল মাইল, অর্থাৎ প্রায় ১১,৭২৩ কিলোমিটার। ঢাকা-নিউইয়র্কের গ্রেট-সার্কেল দূরত্ব ১২,৬৮১ কিলোমিটার। অর্থাৎ পূর্ণ যাত্রী নিয়ে এই উড়োজাহাজ ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক বা লস অ্যাঞ্জেলেসে সরাসরি যেতে পারে না। বিমানের নেটওয়ার্কে ৭৮৭-১০-এর জন্য কোনো রুট নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের চার থেকে ছয় ঘণ্টার রুট, যেখানে বাংলাদেশি প্রবাসী যাত্রী সবচেয়ে বেশি, সেখানে ছোট ন্যারোবডি উড়োজাহাজ আর্থিকভাবে দক্ষ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াও তাই। ইউরোপের রুটে হিথ্রোর স্লট সমস্যা প্রধান, উড়োজাহাজ সমস্যা না। উত্তর আমেরিকার সরাসরি রুটে এই বিশেষ ভেরিয়েন্ট পৌঁছাতেই পারছে না। অর্ডারটি একটি তালিকা, যা ফিট করার মতো রুট খুঁজছে।
পাকিস্তান কী দিল, শ্রীলঙ্কা কী দিল
প্রতিবেশী দুই দেশের তুলনা চোখে পড়ে। পাকিস্তান ১৯ শতাংশ শুল্ক পেয়েছে, কোনো বোয়িং না কিনেই। শ্রীলঙ্কা ২০ শতাংশ পেয়েছে, কোনো উড়োজাহাজ চুক্তি ছাড়াই।
পাকিস্তান যা দিয়েছে সেটা শূন্য না। ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ পাকিস্তানের ফ্রন্টিয়ার ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন আর মার্কিন US Strategic Metals একটি ৫০ কোটি ডলারের জরুরি-খনিজ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে, সঙ্গে তেল-সম্পদে মার্কিন প্রবেশাধিকারের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু পাকিস্তানের এই প্রতিশ্রুতিগুলো দীর্ঘমেয়াদি, শর্তসাপেক্ষ, সম্পদ-অনুসন্ধান-নির্ভর; অর্থায়ন বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি কঠিন, রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তায় বাঁধা, ২০ বছরের নগদ বাধ্যবাধকতা।
পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের চুক্তি যদি বাস্তবায়িত না হয়, কী হারাবে সেটা বাংলাদেশের কোষাগারে দেখাবে না, এবং পাকিস্তানের কোষাগারেও সরাসরি নগদ বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। বাংলাদেশের চুক্তি বাস্তবায়িত হলে প্রতি বছর কী যাবে সেটা স্বাস্থ্য আর শিক্ষা বাজেটে দেখাবে।
বাংলাদেশের আলোচকরা যে আট সপ্তাহে ছিলেন, তাতে এই বিকল্পগুলো পরীক্ষা করার সময় ছিল না। সময়-অভাবের দাম ৪৫ হাজার কোটি টাকা।
যে প্রতিষ্ঠান এই উড়োজাহাজ চালাবে
দাম নিয়ে যা বলা গেল, তা মাঝারি প্রশ্ন। বড় প্রশ্ন অপারেটরের সক্ষমতা।
বিমানের বিদ্যমান ওয়াইডবডির মধ্যে একই দিনে একাধিক উড়োজাহাজ অচল অবস্থায় পাওয়া গেছে, এমন স্ন্যাপশট ২০২৫ মাঝামাঝি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড আর বিডিনিউজ২৪-এ এসেছে; বিশ্ব শিল্প-গড় অচল হার ৫ থেকে ১০ শতাংশ, বিমানের সেই দিনের হার তার বহুগুণ। বিমানের নিয়মিত উড়োজাহাজ-প্রতি ব্যবহার তথ্য প্রকাশ করা হয় না, কিন্তু ১,৬০২ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা আর সাড়ে দুই মাসে ৩৫টি কারিগরি ত্রুটির প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায় ব্যবহার-হার বৈশ্বিক গড়ের অনেক নিচে।
পাইলট নিয়োগের একটা ঘটনা একই গল্প বলে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিমান ১৪ জন চুক্তিভিত্তিক পাইলট নিয়োগ দেয় বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর চালানোর জন্য, "জরুরি প্রয়োজনের" কথা বলে। ধরন-প্রশিক্ষণ পরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত উড়তে পেরেছেন মাত্র পাঁচজন; বাকিরা জাল সনদ, অযোগ্যতা ও লাইসেন্সিং পরীক্ষায় ব্যর্থতায় আটকে যান (দ্য ডেইলি স্টার)। সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকেই লিখিতভাবে "নিরাপত্তা উদ্বেগ" হিসেবে চিহ্নিত করে; প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত তদন্তের নির্দেশ দেয়। অর্থাৎ ঘাটতির ফাঁকটি বিচার বা ভাগ্যের না, নিয়োগ-প্রক্রিয়ার, এবং সেটি একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার নথিতে লিপিবদ্ধ। যে প্রতিষ্ঠান নিজেকে পাইলট-ঘাটতিতে আছে বলে ঘোষণা দিচ্ছে, তার চূড়ান্ত পর্যায়ে এমন প্রার্থী আসছেন যাঁদের ৯ জনই (১৪-র ৬৪ শতাংশ) ছেঁকে বাদ পড়েন।
বিমানের প্রকৌশল কর্মীদের বলা হচ্ছে "অতিরিক্ত চাপে ও ক্লান্ত", প্রতিবেদন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে। জরুরি বোয়িং যন্ত্রাংশের ঘাটতিতে নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ পেছাচ্ছে। ম্যানচেস্টার রুট মার্চ ২০২৬-এ স্থগিত। নিউইয়র্ক ২০০৬ সাল থেকে বন্ধ। মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক রুট লোকসানের কারণে স্থগিত।
যে প্রতিষ্ঠান নিজের বর্তমান বহরই দক্ষতার সঙ্গে চালাতে পারছে না, তার বহরে আরও ৭৪ শতাংশ যোগ করার (১৯ থেকে ৩৩টি উড়োজাহাজ) কোনো কারিগরি যুক্তি নেই। বহর বাড়ানো মানে চালানোর সক্ষমতা বাড়ানো না; বহর বাড়ানো মানে নতুন রক্ষণাবেক্ষণ চাপ, নতুন পাইলট চাহিদা, নতুন স্পেয়ার পার্টস পাইপলাইন। বিমানের প্রতিটি দুর্বলতা নতুন বহরের সাথে গুণ হবে।
দুর্নীতি না, অদক্ষতা
দুর্নীতির কথা এতক্ষণ বলা হয়নি, ইচ্ছা করেই। কারণ এই লেখার মূল কথা হলো, দুর্নীতি বিমানের সবচেয়ে বড় সমস্যা না, এমনকি দ্বিতীয় বড়ও না।
বিমানের অভ্যন্তরীণ অডিটে কার্গো বিভাগে ১১৮ কোটি ৪০ লাখ টাকার আত্মসাৎ ধরা পড়ে, যার ভিত্তিতে দুদক ২০১৯ সালে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিমানের ফ্লাইটে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণ পাচার ধরা পড়েছিল। এই সংখ্যাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোও বছরে দু-চারশ কোটির পরিসরে।
নতুন বোয়িং চুক্তির বার্ষিক ঋণসেবা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হিসাবে দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ একটি আট-সপ্তাহের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রতি বছর যে অর্থ বের করে নেবে, তার পরিমাণ এক দশকের সবচেয়ে কুখ্যাত দুর্নীতির ঘটনাগুলোর বার্ষিক যোগফলের চেয়ে এক মাত্রা বড়।
দুর্নীতি একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতর সম্পদ স্থানান্তর করে, যা খারাপ। কিন্তু অদক্ষতা ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত সম্পদকে এক খাত থেকে আরেক খাতে স্থানান্তর করে, যেখানে উদ্দেশ্যই বদলে যায়। স্বাস্থ্য থেকে অপব্যয়ে। শিক্ষা থেকে কর্পোরেট সরবরাহকারীর হাতে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্রোধ স্বাভাবিক, ন্যায্যও। কিন্তু সরকারি কোষাগার রক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে অদক্ষতাই বড় শত্রু, এবং সেটা চুপচাপ ঘটে।
স্বাস্থ্য আর শিক্ষার রক্তক্ষরণ
হিসাবটা সরাসরি জনজীবনে নামানো যাক।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে বরাদ্দ ৪১,৯০৮ কোটি টাকা। নতুন বোয়িং চুক্তির বার্ষিক ঋণসেবা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হিসাবে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ স্বাস্থ্য বাজেটের ৩.৬ থেকে ৪.৮ শতাংশ প্রতি বছর, বিশ বছর ধরে, এই উড়োজাহাজের ঋণে যাবে। ব্যাখ্যা করে বললে, বছরে গড়ে এক থেকে দেড় মাসের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা চালানোর সমপরিমাণ অর্থ।
সারাদেশের কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যা যায়, বিশেষত সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশালের মতো কম-সম্পদের অঞ্চলে যেখানে অপুষ্টি ও দারিদ্র্য সবচেয়ে বেশি, সেই খাতের একটা স্থিতিশীল অংশের সমান অর্থ এখন বোয়িংয়ের লেনদেন ব্যাংকে যাবে। যে সাব-সেন্টারে আজ স্যালাইন বা ভ্যাকসিন ফুরিয়ে যায়, তার পরের চালানের অর্থ এই খাত থেকেই কাটা পড়ে।
শিক্ষা খাতের চিত্র আরও স্পষ্ট। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বরাদ্দ ২৮,৫৫৭.৪৩ কোটি টাকা (মোট এডিপির ১২.৪২ শতাংশ)। বিমান চুক্তির পুরো অর্থমূল্য (৪৫,৪০৮ কোটি টাকা) পুরো শিক্ষা উন্নয়ন বরাদ্দের প্রায় দেড় বছরের সমান। এই বরাদ্দে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ, এবং উচ্চশিক্ষার অবকাঠামো সব অন্তর্ভুক্ত। বার্ষিক ঋণসেবা প্রতি বছর শিক্ষা উন্নয়ন বরাদ্দের ৫ থেকে ৭ শতাংশ গ্রাস করবে।
এই সংখ্যাগুলো একটি সিদ্ধান্তের ফল, যেটি আট সপ্তাহে নেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি সপ্তাহ যা চিন্তায় ব্যয় হয়নি, তার মূল্য চুকাতে হবে বিশ বছর ধরে। যে শিক্ষক ২০৩৩ সালে নিয়োগ পেতেন, যে ক্লিনিক ২০৩৬ সালে চালু হতো, যে পুষ্টি কর্মসূচি ২০৪০ সালে সম্প্রসারিত হতো, সেগুলোর হিসাব আজকের চুক্তির হিসাবে অদৃশ্য।
বিকল্প: কী হতে পারত, এবং কে কী করবে
বিমান যদি কিনতেই হতো, কিনুক, কিন্তু অন্যভাবে। সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ার পাঁচটি নির্দিষ্ট সংশোধন, প্রত্যেকটির জন্য একজন দায়িত্বশীল এবং একটি যাচাইযোগ্য সাফল্য-সংকেত:
- ইউনিট-দাম প্রকাশ (বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিমান বোর্ড)। চুক্তির ইউনিট-প্রতি প্রকৃত দাম ও ছাড়-হার ৬০ দিনের মধ্যে প্রকাশ করা হোক। সাফল্য-সংকেত: প্রতি ভেরিয়েন্টের প্রকাশিত ছাড় শিল্প-গড় ৩০-৫০ শতাংশের কাছাকাছি কি না, তা বাইরে থেকে যাচাইযোগ্য হবে।
- বহর-আকার ও মিশ্রণ পুনর্বিবেচনা (বিমান বহর পরিকল্পনা কমিটি)। ১৪টি না, প্রকৃত রুট-নেটওয়ার্কের সাথে মিল রেখে আট থেকে দশটি; ৭৮৭-১০-এর বদলে অধিকতর ৭৩৭ ম্যাক্স ও মাঝারি ওয়াইডবডি। সাফল্য-সংকেত: প্রতিটি অর্ডারকৃত ভেরিয়েন্টের জন্য একটি বিদ্যমান বা পরিকল্পিত লাভজনক রুট নথিভুক্ত আছে কি না।
- বিকল্প সরবরাহকারী যাচাই (বিমান কারিগরি বিভাগ)। এয়ারবাস A330neo, A321XLR এবং মিশ্র বহরের রুট-ভিত্তিক মুনাফা-লোকসান বিশ্লেষণ প্রকাশ করা হোক। সাফল্য-সংকেত: একাধিক সরবরাহকারীর তুলনামূলক মূল্যায়ন বোর্ডের নথিতে আছে।
- অপারেটর-চালিত সংগ্রহ (বিমান বোর্ড, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নয়)। ভবিষ্যৎ বহর-অর্ডার বিমানের নিজস্ব পরিকল্পনা প্রক্রিয়া থেকে উঠুক, রাজনৈতিক প্যাকেজ থেকে নয়। সাফল্য-সংকেত: অর্ডার-প্রস্তাবে অপারেটরের কারিগরি স্বাক্ষর আছে।
- সংসদীয় অনুমোদন (অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংসদ)। বিশ বছরের সার্বভৌম-গ্যারান্টিযুক্ত বাধ্যবাধকতা সংসদে বিতর্ক ও ভোটের পর কার্যকর হোক। সাফল্য-সংকেত: চুক্তিটি একটি প্রকাশ্য সংসদীয় ভোটে নথিভুক্ত।
পাল্টা যুক্তি এবং কী হলে সিদ্ধান্ত বদলাবে
সবচেয়ে শক্ত পাল্টা যুক্তিটি সরকারের পক্ষে: শুল্ক ৩৫ থেকে ১৯ শতাংশে নামানো বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের পোশাক-রপ্তানি বাঁচায়, আর সেই তুলনায় ১,৫০০-২,০০০ কোটি টাকার বার্ষিক ঋণসেবা সস্তা বীমা-প্রিমিয়াম। বিমানের প্রধান নির্বাহীও বলেছেন (বিএসএস), সিদ্ধান্তটি পরিচালন ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে নেওয়া।
এই যুক্তির দুর্বলতা স্পষ্ট। শুল্ক-সুবিধা আর উড়োজাহাজ কেনা এক জিনিস না: পাকিস্তান একই ১৯ শতাংশ পেয়েছে কোনো বিমান না কিনেই, শ্রীলঙ্কা ২০ শতাংশ পেয়েছে কোনো উড়োজাহাজ চুক্তি ছাড়াই। তাই প্রশ্ন শুল্ক-ছাড় বনাম শূন্য নয়, প্রশ্ন একই কূটনৈতিক লক্ষ্যে আরও সস্তা পথ ছিল কি না।
কী হলে এই উপসংহার বদলাবে: যদি সরকার প্রকাশ করে যে ইউনিট-প্রতি প্রকৃত ছাড় ৩০-৫০ শতাংশের কাছাকাছি, এবং প্রতিটি ভেরিয়েন্টের জন্য একটি লাভজনক রুট-পরিকল্পনা আছে, এবং শুল্ক-ছাড়টি স্পষ্টভাবে এই উড়োজাহাজ কেনার শর্তে বাঁধা ছিল, তবে অপব্যয়ের অভিযোগ অনেকটাই দুর্বল হয়ে যাবে। সেই তিনটি তথ্যই এখন সরকারের হাতে এবং অপ্রকাশিত। অপ্রকাশই মূল সমস্যা।
২০৪৫: যাঁরা বিল চুকাবেন
আজ যে চুক্তি স্বাক্ষর হলো, তার শেষ ঋণ কিস্তি পরিশোধ হবে ২০৪৫ সালে। সেই দিন যাঁরা এই বিল চুকাবেন, তাঁদের বেশিরভাগই আজ স্কুলেও পৌঁছাননি। তাঁদের নাম এই আট-সপ্তাহের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার কোনো নথিতে নেই।
জনগণ যা জানে না, জনগণ তা সংশোধনও করতে পারে না। আর যে নাগরিক ক্ষতি বলতে শুধু দুর্নীতিকেই চেনেন, তিনি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অদক্ষতাকে চিনতে পারেন না, যা প্রকৃতপক্ষে অনেক বড় ক্ষতি করে।
বিমানের ১৪টি বোয়িং একটি ছবি। ছবির ভেতরের বিল এক প্রজন্মের। ছবিটা দেখা সহজ, বিলটা পড়া কঠিন।
লেখক: নীতিগবেষক, বিডিপলিসিল্যাব। সব তথ্যসূত্র ও বিস্তৃত বিশ্লেষণ "The Boeing Bill" ইংরেজি বিশ্লেষণে পাওয়া যাবে।
তথ্যসূত্র
- বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১৪টি বোয়িং ৭৮৭ ও ৭৩৭ ম্যাক্স অর্ডার করেছে, বোয়িং মিডিয়ারুম, ৩০ এপ্রিল ২০২৬: ৮টি ৭৮৭-১০, ২টি ৭৮৭-৯, ৪টি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স; মোট ৩৭০ কোটি ডলার; প্রথম ডেলিভারি অক্টোবর ২০৩১।
- বিমান ৩৭০ কোটি ডলারে বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি করল, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২০২৬: ৩৭০ কোটি ডলার তালিকা মূল্যে ধরা; পরিশোধ ২০ বছরে, বার্ষিক ১,৫০০-২,০০০ কোটি টাকা; EXIM Bank অর্থায়ন ও সার্বভৌম গ্যারান্টি।
- বিমান ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭৮৫.২১ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫: নিট মুনাফা ৭৮৫.২১ কোটি, মোট আয় ১১,৫৫৯ কোটি, পরিচালন মুনাফা ১,৬০২ কোটি টাকা।
- Boeing 787-10 ফ্লিট ফ্যাক্টস, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ: ৭৮৭-১০ সর্বোচ্চ পরিসর ৬,৩৩০ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ১১,৭২৩ কিমি)।
- DAC-JFK দূরত্ব, Air Miles Calculator: ঢাকা-নিউইয়র্ক গ্রেট-সার্কেল দূরত্ব ১২,৬৮১ কিলোমিটার।
- Boeing 787 Dreamliner-এর দাম ২০২৬, Simple Flying: বড় ওয়াইডবডি অর্ডারে প্রকৃত দাম তালিকা মূল্যের চেয়ে ৩০-৫০ শতাংশ কম; বোয়িং ২০১৮-র পর তালিকা মূল্য প্রকাশ বন্ধ করে।
- বোয়িং চুক্তি বিমানচালনা কৌশলের চেয়ে ভূরাজনীতিকেই বেশি প্রতিফলিত করে, দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদকীয়: ক্রয় প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিগত সমালোচনা।
- বিমানের বোয়িং ক্রয় সিদ্ধান্ত পরিচালন ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে, বিএসএস: প্রধান নির্বাহীর অবস্থান।
- বিমান অযোগ্য বোয়িং ৭৭৭ পাইলট নিয়োগের মূল্য দিচ্ছে, দ্য ডেইলি স্টার: ২০২২-এ ১৪ জনের মধ্যে মাত্র ৫ জন উড়েছেন; CAAB নিয়োগ-প্রক্রিয়াকে "নিরাপত্তা উদ্বেগ" বলে চিহ্নিত করেছে।
- পাকিস্তান-মার্কিন ৫০ কোটি ডলারের জরুরি-খনিজ চুক্তি, আল জাজিরা, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫: US Strategic Metals-এর সঙ্গে ৫০ কোটি ডলারের সমঝোতা স্মারক ও তেল-সম্পদে প্রবেশাধিকারের প্রতিশ্রুতি।
- যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের শুল্ক ৩৫ থেকে ২০ শতাংশে নামাল, বিএসএস: প্রাথমিক ৩৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে হ্রাস; পরে ১৯ শতাংশে স্থির।
- ২০২৫-২৬ অর্থবছরের স্বাস্থ্য বাজেট ৪১,৯০৮ কোটি টাকা, বিএসএস: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে বরাদ্দ ৪১,৯০৮ কোটি টাকা।
- ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ২,৩০,০০০ কোটি টাকার এডিপি, বিএসএস: শিক্ষা খাতের এডিপি বরাদ্দ ২৮,৫৫৭.৪৩ কোটি টাকা (১২.৪২ শতাংশ)।