Back to Research
Narrative 2026-04-30

৪৫ হাজার কোটি টাকা, কী কিনলাম?

বিমানের চুক্তি, স্বাস্থ্য-শিক্ষার বিল

একটি দেশের পুরো এক বছরের জাতীয় স্বাস্থ্য বরাদ্দের সমান অর্থ গতকাল থেকে আগামী বিশ বছর ধরে একটি বিদেশি উড়োজাহাজ কোম্পানির ঋণসেবায় বরাদ্দ হলো। সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়েছিল আট সপ্তাহে। সংসদে আলোচনা হয়নি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিজস্ব বহর পরিকল্পনা কমিটি এই অর্ডারের কথা জানতে পেরেছে অর্ডার দেওয়ার পরে। এই লেখার বিষয় সেই সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া এবং তার বিশ বছরের দাম।

৩০ এপ্রিল বিমান বাংলাদেশ বোয়িংয়ের সঙ্গে ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকার (৩৭০ কোটি ডলার) চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। মোট ১৪টি উড়োজাহাজ। আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯, চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স। প্রথম ডেলিভারি ২০৩১ সালে, শেষটি ২০৩৫ সালে। সরকারি ঘোষণায় একে বলা হচ্ছে বিমানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বহর সম্প্রসারণ।

বহর সম্প্রসারণ নয়। এই চুক্তি একটি শুল্ক চুক্তির শেষ কিস্তি, যেখানে উড়োজাহাজ মুদ্রা। জুলাই ২০২৫-এ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্কের হুমকি দেন। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইন্দোনেশিয়ার মডেল অনুসরণ করে ২৫টি বোয়িং কেনার প্রস্তাব পাঠায়। শুল্ক ২০ শতাংশে নামে। নতুন সরকার ফেব্রুয়ারিতে এসে অর্ডার ১৪-তে নামালেন, শুল্ক আরও এক পয়েন্ট কমে ১৯ হলো।

পৃথিবীর কোনো বড় উড়োজাহাজ সংস্থা আট সপ্তাহে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বহর সিদ্ধান্ত নেয় না। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স সাধারণত ১৮ থেকে ২৪ মাস ধরে বিকল্প যাচাই করে। এমিরেটসের দীর্ঘমেয়াদি বহর কমিটি প্রতিটি বড় অর্ডারে রুট-ভিত্তিক মুনাফা-লোকসান সমতা বিন্দুর হিসাব, প্রকৌশল সক্ষমতা যাচাই, এবং পরিচালনা পর্ষদের একাধিক স্তর পার করে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে যখন এই অর্ডার গেল, তখন বিমানের নিজস্ব বহর পরিকল্পনা কমিটিকে এই সিদ্ধান্তের কথাই জানানো হয়নি। বিডিনিউজ২৪-এর প্রতিবেদনে বিমানের সাবেক পর্ষদ সদস্যরা বলেছেন, অর্ডার দেওয়ার পর তাঁদের বলা হয়েছে: এই উড়োজাহাজগুলো তোমরা চালাবে। এটা সংগ্রহ পদ্ধতি নয়। এটা একটি রাজনৈতিক চুক্তিতে উড়োজাহাজের তালিকা টেপ দিয়ে আটকানো।

দাম নিয়ে দু-একটি কথা বলা দরকার, কারণ সরকার নিজে এই হিসাবটা দিচ্ছে না। বোয়িংয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত তালিকা মূল্য (২০১৮): ৭৮৭-১০ এর জন্য ৩৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ৭৮৭-৯ এর জন্য ২৯ কোটি ২০ লাখ ডলার, ৭৩৭-৮ ম্যাক্সের জন্য ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার। বাংলাদেশের অর্ডারের গঠনকে এই তালিকায় গুণ করলে মোট দাঁড়ায় প্রায় ৩৭৮ কোটি ডলার। বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে ৩৭০ কোটি ডলারে। অর্থাৎ প্রকৃত ছাড় কার্যত শূন্য। বিশ্ব শিল্প-গড়ে ওয়াইডবডি অর্ডারে ৩৫ থেকে ৫৫ শতাংশ ছাড় হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশের জন্য একটি যথাযথভাবে আলোচিত চুক্তি ২০০ থেকে ২৪০ কোটি ডলারের মধ্যে হওয়ার কথা ছিল। অতিরিক্ত পরিশোধ আনুমানিক ১৩০ থেকে ১৫০ কোটি ডলার, অর্থাৎ ১৬ থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা।

পাশাপাশি একটি দ্বিতীয় ভুল আরও বড়। অর্ডারের মধ্যে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০। এই ভেরিয়েন্টটি পরিবারের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে দামি, এবং এর সর্বোচ্চ পরিসর ১১,৭২৩ কিলোমিটার। ঢাকা-নিউইয়র্কের সরাসরি দূরত্ব ১২,৬৮২ কিলোমিটার। অর্থাৎ এই উড়োজাহাজ ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক বা লস অ্যাঞ্জেলেসে সরাসরি যেতে পারে না। বিমানের নেটওয়ার্কে ৭৮৭-১০-এর জন্য কোনো রুট নেই। মধ্যপ্রাচ্য চার থেকে ছয় ঘণ্টার রুট, যেখানে ছোট ন্যারোবডি উড়োজাহাজ দক্ষ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াও তাই। ইউরোপের রুটে হিথ্রোর স্লট সমস্যা প্রধান, উড়োজাহাজ সমস্যা নয়। উত্তর আমেরিকার সরাসরি রুটে এই উড়োজাহাজ যেতে পারছে না। অর্ডারটি একটি তালিকা, যা ফিট করার মতো রুট খুঁজছে।

পাকিস্তানের কথা আনতে হয়। পাকিস্তান ১৯ শতাংশ শুল্ক পেয়েছে, কোনো বোয়িং না কিনেই। শ্রীলঙ্কা ২০ শতাংশ পেয়েছে, কোনো উড়োজাহাজ চুক্তি ছাড়াই। পাকিস্তান যা দিয়েছে সেটা শূন্য নয়, অফশোর তেল ব্লকে সহ-অংশীদারিত্ব এবং একটি জরুরি খনিজ চুক্তি, যেগুলোর বর্তমান মূল্য ২ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের পরিসরে। কিন্তু পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতি দীর্ঘমেয়াদি, শর্তসাপেক্ষ, সম্পদ-বিনিময় প্রকৃতির। বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি কঠিন, রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তায় বাঁধা, ২০ বছরের নগদ বাধ্যবাধকতা। বাংলাদেশের আলোচকরা যে আট সপ্তাহে ছিলেন, তাতে এই বিকল্পগুলো পরীক্ষা করার সময় ছিল না। সময়-অভাবের দাম ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

যে প্রতিষ্ঠান এই উড়োজাহাজ চালাবে

এই অর্ডারের মাঝারি প্রশ্ন হলো দাম, বড় প্রশ্ন হলো অপারেটর। বিমানের ১০টি ওয়াইডবডি উড়োজাহাজের মধ্যে চারটি একই দিনে অচল অবস্থায় পাওয়া গেছে, এমন স্ন্যাপশট ২০২৫ মাঝামাঝি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও বিডিনিউজ২৪-এ এসেছে। সেদিনের অচল হার ৪০ শতাংশ। বিশ্ব শিল্প-গড় ৫ থেকে ১০ শতাংশ। বোয়িং প্রকাশ করেছে, বৈশ্বিক ৭৮৭ বহর গড়ে দিনে ১২ ঘণ্টার বেশি ওড়ে। বিমানের নিয়মিত উড়োজাহাজ-প্রতি ব্যবহার তথ্য প্রকাশ করা হয় না, কিন্তু ১,৬০২ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা ও সাড়ে দুই মাসে ৩৫টি কারিগরি ত্রুটি থেকে বোঝা যায় সংখ্যাটি গড়ের অনেক নিচে।

পাইলট নিয়োগের ঘটনাটি একই গল্প বলে। ২০২৪ সালে বিমান ১৪ জন চুক্তিভিত্তিক পাইলট নিয়োগ দেয় বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর চালানোর জন্য, জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে। ধরন-প্রশিক্ষণ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন মাত্র পাঁচজন। সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকেই "নিরাপত্তা উদ্বেগ" হিসেবে চিহ্নিত করে। প্রশ্নটা পরীক্ষায় কারা পাশ করলেন সেটা নয়। প্রশ্নটা হলো, যে প্রতিষ্ঠান নিজেকে পাইলট ঘাটতিতে আছে বলে ঘোষণা দিচ্ছে, সে এমন প্রার্থীদের চূড়ান্ত পর্যায়ে আনছে যাঁদের ৬৪ শতাংশ ছেঁকে বাদ পড়েন।

বিমানের প্রকৌশল কর্মীদের বলা হচ্ছে "অতিরিক্ত চাপে ও ক্লান্ত," প্রতিবেদন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে। জরুরি বোয়িং যন্ত্রাংশের ঘাটতিতে নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ পেছাচ্ছে। ম্যানচেস্টার রুট মার্চ ২০২৬-এ স্থগিত। নিউইয়র্ক ২০০৬ সাল থেকে বন্ধ। মধ্যপ্রাচ্যে ছয়টি রুট লোকসানের কারণে স্থগিত। রোম ১৫ বছর বন্ধ থাকার পর এখন টরন্টো রুটের একটি যাত্রা-বিরতি মাত্র। যে প্রতিষ্ঠান নিজের বর্তমান বহরই দক্ষতার সঙ্গে চালাতে পারছে না, তার বহরে আরও ৬৭ শতাংশ যোগ করার কোনো কারিগরি যুক্তি নেই।

দুর্নীতির কথা এতক্ষণ বলা হয়নি, ইচ্ছা করেই। কারণ এই লেখার মূল কথা হলো, দুর্নীতি বিমানের সবচেয়ে বড় সমস্যা নয়, এমনকি দ্বিতীয় বড়ও নয়। বিমানের অভ্যন্তরীণ অডিটে দশ বছরে কার্গো বিভাগ থেকে ৩৬০ কোটি টাকা লোপাট ধরা পড়েছে। বাংলাদেশ পোস্ট ও ডেইলি মেসেঞ্জারের প্রতিবেদনে দেখা গেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দিনে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা টিকেট ব্লক করে আদায় করত, বছরে যা ৭৩ থেকে ৯১ কোটি। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিমানের ফ্লাইটে ৭৫৬ কেজি স্বর্ণ পাচার ধরা পড়েছিল। এই সংখ্যাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সবচেয়ে বড় সংখ্যাগুলোও বছরে দু-চারশ কোটির পরিসরে।

নতুন বোয়িং চুক্তির বার্ষিক ঋণসেবা দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ একটি রাত-একদিনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রতি বছর যে অর্থ বের করে নেবে, তার পরিমাণ এক দশকের সবচেয়ে কুখ্যাত দুর্নীতির ঘটনাগুলোর বার্ষিক যোগফলের চেয়ে এক মাত্রা বড়। দুর্নীতি একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতর সম্পদ স্থানান্তর করে। অদক্ষতা ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত সম্পদকে এক খাত থেকে আরেক খাতে স্থানান্তর করে, যেখানে উদ্দেশ্যই বদলে যায়। স্বাস্থ্য থেকে অপব্যয়ে। শিক্ষা থেকে কর্পোরেট সরবরাহকারীর হাতে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্রোধ স্বাভাবিক, ন্যায্যও। কিন্তু সরকারি কোষাগার রক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে অদক্ষতাই বড় শত্রু।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষার রক্তক্ষরণ

হিসাবটা সরাসরি পাবলিকের জীবনে নামানো যাক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণের বরাদ্দ ৪১,৯০৮ কোটি টাকা। নতুন বোয়িং চুক্তির বার্ষিক ঋণসেবা ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ স্বাস্থ্য বাজেটের ৩.৬ থেকে ৪.৮ শতাংশ প্রতি বছর, বিশ বছর ধরে, এই উড়োজাহাজের ঋণে যাবে। ব্যাখ্যা করে বললে, বছরে গড়ে এক থেকে দুই মাসের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা চালানোর সমপরিমাণ অর্থ। সারাদেশের প্রায় ১৮,০০০ কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যা যায়, বিশেষত সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশালের মতো কম-সম্পদের অঞ্চলে যেখানে অপুষ্টি ও গরিবি সবচেয়ে বেশি, সেই খাতের একটা স্থিতিশীল অংশ এখন বোয়িংয়ের লেনদেন ব্যাংকে যাবে।

শিক্ষা খাতের চিত্রটা আরও স্পষ্ট। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বরাদ্দ আনুমানিক ২৫,০০০ কোটি টাকা। বিমান চুক্তির পুরো অর্থমূল্য পুরো শিক্ষা উন্নয়ন বরাদ্দের প্রায় দেড় বছরের সমান। এই বরাদ্দে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ, এবং উচ্চশিক্ষার অবকাঠামো সব অন্তর্ভুক্ত। বার্ষিক ঋণসেবা প্রতি বছর শিক্ষা উন্নয়ন বরাদ্দের ৬ থেকে ৮ শতাংশ গ্রাস করবে।

এই সংখ্যাগুলো একটি সিদ্ধান্তের ফল, যেটি আট সপ্তাহে নেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি সপ্তাহ যা চিন্তায় ব্যয় হয়নি, তার মূল্য চুকাতে হবে বিশ বছর ধরে। যে শিক্ষক ২০৩৩ সালে নিয়োগ পেতেন, যে ক্লিনিক ২০৩৬ সালে চালু হতো, যে পুষ্টি কর্মসূচি ২০৪০ সালে সম্প্রসারিত হতো, সেগুলোর হিসাব আজকের চুক্তির হিসাবে অদৃশ্য।

বিমান যদি কিনতেই হয়, কিনুক। কিন্তু ১৪টি নয়, আট থেকে দশটি। ৭৮৭-১০ নয়, প্রধানত ৭৩৭ ম্যাক্স। গোপন তালিকা মূল্যে নয়, প্রকাশ্য আলোচিত দামে। আট সপ্তাহে নয়, যথেষ্ট সময় নিয়ে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অর্ডারে নয়, বিমানের নিজস্ব বহর পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায়। সংসদের বাইরে নয়, সংসদে বিতর্কের পর। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুধু নয়, অদক্ষতা ও তাড়াহুড়োর বিরুদ্ধেও। কারণ এই দুটো একই ক্ষতি নয়, এবং বড়টা চুপচাপ ঘটে।

আজ যে চুক্তি স্বাক্ষর হলো, তার শেষ ঋণ কিস্তি পরিশোধ হবে ২০৪৫ সালে। সেই দিন যাঁরা এই বিল চুকাবেন, তাঁদের বেশিরভাগই আজ স্কুলেও পৌঁছাননি। তাঁদের নাম এই আট-সপ্তাহের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার কোনো নথিতে নেই। জনগণ যা জানে না, জনগণ তা সংশোধনও করতে পারে না। আর যে নাগরিক ক্ষতি বলতে শুধু দুর্নীতিকেই চেনেন, তিনি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অদক্ষতাকে চিনতে পারেন না, যা প্রকৃতপক্ষে অনেক বড় ক্ষতি করে।


লেখক: নীতিগবেষক, বিডিপলিসিল্যাব। সব তথ্যসূত্র ও বিস্তৃত বিশ্লেষণ "The Boeing Bill" নীতি বিশ্লেষণে পাওয়া যাবে।

Created: 2026-04-30 20:36:37 Updated: 2026-04-30 20:43:08